সভ্যতার কারিগর ।। মোহাম্মদ সোহেল হোসেন ।।

অসময়ে ঘরে শুয়ে থাকতে দেখে স্বপনের স্ত্রী আমিনা স্বপনকে বলল, কি ব্যাপার?অসময়ে ঘরে শুয়ে আছো যে, কাজে যাবে না ?স্বপন কোন উত্তর করলো না। তাঁর মনের অবস্থা ভালো না।আমিনা  আবার বলল, কি হল! কথার জবাব দিচ্ছ না যে ।স্বপন অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও বহু কষ্টে, নিরুত্তাপভাবে জবাব দিল, না।গত দু’দিন ও তো…

অসময়ে ঘরে শুয়ে থাকতে দেখে স্বপনের স্ত্রী আমিনা স্বপনকে বলল, কি ব্যাপার?
অসময়ে ঘরে শুয়ে আছো যে, কাজে যাবে না ?
স্বপন কোন উত্তর করলো না। তাঁর মনের অবস্থা ভালো না।
আমিনা  আবার বলল, কি হল! কথার জবাব দিচ্ছ না যে
স্বপন অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও বহু কষ্টে, নিরুত্তাপভাবে জবাব দিল, না।
গত দুদিন ও তো কাজে গেলেন না
স্বপনের মেজাজ চড়িয়া আছে; কথা শুনবার মতো মানসিক অবস্থা এখন তার নেই। ভালো খারাপ যে কোন রকম কথা শুনলেই তার গায়ে জ্বালা দিয়ে উঠছে, মেজাজ আরও চড়িয়া উঠছে।
স্বপন থাকে নারিন্দা বস্তির একটা টংয়ের মতো ঘরে। এই টংয়ের মত ঘরের ভাড়া মাসে ছয়শ টাকা। স্বপনের ছোট্ট সংসার। সে তার বউ আমিনা তার কন্যা বকুলকে নিয়ে এই টংয়ের মধ্যে তিনজন কোনমতে থাকতে পারে। রান্না করতে হয়, বাইরে গিয়ে। বাথরুম করার জন্য ও বাইরে যেতে হয়। স্বপনের তাতে সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় আমিনা আর বকুলের। আমিনা, বকুল কেউই রাতের বেলা বাইরে যেতে চায় না।  আমিনা কয়েকবার বলেছে বাসাটা বদল করে একটা ভালো বাসায় যাবোঅন্তত বাথরুম আছে, এমন একটা বাসা ভাড়া নিতে। স্বপন প্রতিবারই কথাটি শুনে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করেছে। সাধ থাকলেও তার সাধ্য নেই।
স্বপন একজন ঝাড়ুদার। সে নগরের সকল ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে। নগরীকে সুন্দর করে তোলে। স্বপন খুব ভালো আর কর্মঠ। পড়াশুনাও তার আছে। সে ক্লাস এইট পাস করেছে। সে বাংলা-ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতে পারে। দেখে দেখে রিডিং পড়তে পারে। সে যখন রাস্তায় বের হয়, কাজে যায় তখন সে কত কিছু চোখে পড়ে। সামনে যা পায় তাই পড়ে। সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার যত, এমনকি বাস, ট্রাক, সিএনজির পিছনের লেখাগুলোও সে পড়ে। ট্রাকের পিছনের লেখা সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন, কিংবা সিএনজির পিছনে লেখা আমি ছোট আমাকে মাইরেন না, এ সব পড়ে পড়ে সে মনে মনে হাসে । পড়াশুনা তার ভালো লাগে। কিন্তু টাকা না থাকায় আর পড়াশুনা করতে পারেনি।
স্বপন ঝাড়ুদারের কাজ করে, মাসে চারহাজার টাকা পায়। অথব এই কাজ পেতে তাকে ষাট হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সে একা না, যারা যারা এই কাজের সাথে যুক্ত আছে সবাইকে দিতে হয়েছে। অথচ, সে কাজের জন্য সে যোগ্য, গরীব, স্বাস্থ্য ভালো, গড়ন ভালো, আর লিখতে পড়তে জানে। তবু, তাকে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষের টাকাটা জোগাড় করতে যে তাকে কত কষ্ট করতে হয়েছে, মানুষের কাছে হাত পাততে হয়েছে, ঋণ করতে হয়েছে।
এত কষ্টের পরও, স্বপন তার কাজকে সম্মান করতো। আনন্দ নিয়ে কাজ করতো। কখনো নিজের কাজকে সে ছোট চোখে দেখে নি। মনে সে সুখ পেত এই ভেবে যে, কাজ করে খাই; চুরি তো আর করি না। মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষুকের মতো হাতও তো পাতি না।  সুখেই তার দিন কাটছিল।
তবে, সে সিদ্ধান্ত নেয় এখন আর সে এই কাজ করবে না। এই কাজকে কেউ সম্মানের চোখে দেখে না, কেউ তাকে সম্মান করে না, সবাই তাদের নিচ ভাবে। অবজ্ঞা করে।স্বপনের খুবই কষ্ট লাগে। ছোট কাজ করলেই কি মানুষ নিচ হয়ে যায়। ছোট কাজ করলেই কি মানুষের সম্মান নষ্ট হয়ে যায় অবজ্ঞা করতে হয়। সে দিন তো এক লোকের কথায় তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। লোকটা বলল, “মেথরের বাচ্চাটা কই রে? এইখানে যে মেথরের বাচ্চাটা কাজ করে, সে কই?” সে তো আর মেথর না, তার বাবাও তো আর মেথর না। তাদের বংশ তো আর মেথরের বংশ না, আর যদি কেউ মেথর হয় তাইলে কি তার সাথে এভাবে কথা বলতে হবে। সুন্দরভাবে কথা বলা যায় না। মেথররা কি মানুষ না!
তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সব কাজ সে আর করবে না। আর এজন্য স্বপনের মন খারাপ, মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে।
আমিনা বলল, কি হল! কথা বলছো না যে। শরীর খারাপ করলো নাকি? রান্না করার তো কিছু নেই। বাজারে যাবে না?
স্বপন কোন কথা বলল না, সে রাগ কমানোর চেষ্টা করছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমিনা যদি আরেকটা কথা বলে, তাহলে সে আমিনাকে আচ্ছামত কয়েক ঘাঁ লাগাবে। অবশ্য, আমিনাকে মারা ঠিক হবে না। আমিনা বড় ভালো মেয়ে বড় লক্ষ্মী মেয়ে সারা জীবন তার জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছে।
আমিনা বলল, বকুলকে আনতে যাবে না।
বকুলের কথায় স্বপনের মন খারাপ ভাবটা অনেকটা কমে গেল । বকুল এবার পি.এস.সি পরীক্ষা দিচ্ছে। আজকে তার ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষা। বকুলকে নিয়ে স্বপনের স্বপ্নের শেষ নেই। টাকার অভাবে তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বকুলের ও যেন টাকার অভাবে পড়াশুনা বন্ধ না হয়ে যায় সে জন্য সে প্রতি মাসে বেতন পাওয়ার সাথে সাথে সে এক হাজার টাকা আলাদা করে রাখে বকুলের ভবিষ্যৎ পড়াশুনার জন্য।
স্বপন ঘুম থেকে উঠে, শার্ট গায়ে দিতে লাগলো ।
বউ সায় দিতে বলল, কি হল কোথায় চললে?
বকুলকে নিয়ে আসতে যাই। ওর পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। 
স্বপন সারা রাস্তা বকুল নিয়ে ভাবলো। বকুলকে নিয়ে তার ভবনার শেষ নেই। বকুলের পড়ার টেবিলে নেই, খাটের বসে বসে পড়তে হয়। সামনের মাসেই তাকে একটা টেবিল কিনে দিতে হবে।
না জানি, মেয়েটা পরীক্ষা কেমন দিচ্ছে। এমনিতে বকুল খুব ভাল ছাত্রী । সব পরীক্ষায় সে ভালো রেজাল্ট করে। স্কুলের শিক্ষকরাও তার উপর খুব খুশি, প্রশংসাও করে খুব।
স্বপন স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়েমেয়ের ছুটি হয়ে গেছে। সবাই বের হয়ে যাচ্ছে। স্বপন ভীড়ের মাঝে বকুলকে খুঁজে বড়োচ্ছে । বকুল বের হচ্ছে না। ভাবতে ভাবতেই পিছণ দিক থেকে বকুল বেড়িয়ে এসে জোর করে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরলো।
মেয়েটা যে কি ছেলেমানুষি করে। দেখতেই ভালো লাগে। একবারে বাবা ভক্ত হয়েছে, মেয়েটা।
পরীক্ষা কেমন হয়েছে, মা? স্বপন তার মেয়ের কাছে জানতে চায়।
আজ, আমি খুব খুশি বাবা। আজ প্রশ্নে আমাদের কথা লিখেছে।
কি লিখেছে, মা? স্বপন কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল। বকুল ইংরেজি প্যাসেজটা পড়ে, তার বঙ্গানুবাদটা তার বাবাকে বুঝিয়ে দিল। শুনে স্বপনের খুশিতে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না, সব ছেলেমেয়েরা যে প্রশ্নে পরীক্ষা দিল, সে প্রশ্নে তাদের কথা লিখেছে। খেঁটে খাওয়া মানুষকে কথা লিখেছে। লিখেছে, পৃথিবীতে তাদের অবদানের কথা, তারা না থাকলে, মানুষের কত সমস্যা হত, এ সব লিখেছে।
দেখ বাবা, আরও লিখেছে, লিখেছে, শ্রমজীবী মানুষরা হচ্ছে সভ্যতার কারিগর। ঠিকই তো লিখেছে, আমরা যদি না থাকতাম, তাহলে এই রাস্তাঘাট তো ধুলা-ময়লায়ই ভরে থাকতো। কোন মানুষ হাঁটতে পারতো? কোন গাড়ি চলতে পারতো? এই রাস্তা দিয়ে। আমরা না থাকলে কি এত বড় বড় দালান হতে পারতো?
একবারে ঠিক বলেছো, বাবা। বকুল তার বাবার সাথে সম্মতি জানায়। একবার ভেবে দেখ, আমরা না থাকলে মানুষের কত সমস্যা হত। আমাদের প্রশ্নেও সেটা লিখেছে বাবা। আর কি লিখেছে রে, প্রশ্নে, মা!
আরও লিখেছে, কাজের মধ্যে অগৌরবের  কিছু নেই। কাজের মধ্যে ছোট-বড় কিছু নেই। সব কাজই সমান, সব কাজই সম্মানের। একবারে ঠিক লিখেছে যে মা। কাজে কোন লজ্জা নেই, সব কাজই সম্মানের কাজের মধ্যে কোন ছোট বড় নেই, সব কাজ সমান। মানুষের মধ্যেও ছোট বড় নেই। সব মানুষ সমান। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে এসব কথা ভুলে যায়। তবে, এই প্রশ্নটা যে করেছে, সে খুব জ্ঞানী মানুষ। জ্ঞানী মানুষের ভাবনা সব সময় জ্ঞানীর মতই হয়।
স্বপন কালকেই কাজে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নিবুর্দ্ধির মানুষেরা তো কত কথা বলে, সব কথা ধরলে তো আর চলে না। জ্ঞানী মানুষরা তো ঠিক তাদের সম্মান করে। সম্মান না করলে তো আর লিখতো না।
বকুল কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, বাবা আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করি। কেন করবি না। অবশ্যই করবি। তোর! বাবা তো আর ফকিরের মত ভিক্ষা করে না, আবার চোরের মত চুরিও করে না। তোর বাপ সম্মানের কাজ করে টাকা কামায়।
বাবা! এই প্রশ্নটা আমি যত্ন করে তুলে রাখবো। সবাইকে দেখাবো। অবশ্যই, তুলে রাখবি। এখন চল আইসক্রিম খাবি। চল

Related posts

ভালোবাসার সূর্যোদয় ।। মোহাম্মদ সোহেল হোসেন ।।

আঁধারসন্ধ্যা।রাস্তায়তেমনএকটাআলোনেই।হামিদরাস্তারদিকেতাকিয়েহাঁটছে।কানেগানশোনারযন্ত্র।হামিদেরমনটাখারাপ।আজমিতুরসাথেতাররিলেশনব্রেকআপহয়েগেছে।তাইতারমনখারাপ।সেভাবতেপারছে নাএকটাসম্পর্কভাঙ্গাকারোকারোজন্যকতসহজ! তার মাথায় এখনোমিতুরকথাটাঘুরছে।কিসহজেইনাসেবলল “আমিআরএইরিলেশনকনটিনিউকরতেপারবোনা।আমিএইরিলেশনব্রেকআপকরতেচাই।” সেহামিদকেকিছুবলারসুযোগনাদিয়েইচলেগেল।হামিদভাবছেআরহাটছে।হঠাৎসেএকটাকণ্ঠস্বরশুনতেপেল।মেয়েলিকোমলনিচুকিন্তুদৃঢ়কণ্ঠস্বর।হামিদমুখতুলেতাকালো, আঁধারেকিছুঠিকমতবোঝাযাচ্ছেনা।মুখটানেকাবেদিয়েআচ্ছাদিত।তবু, যতটুকুবোঝাযাচ্ছেতাতেমনেহচ্ছেমেয়েটিরূপবতী।নেকাবেরমাঝেওতাররূপেরঝলকবোঝাযাচ্ছে।তাররূপযেননেকাবেরমাঝেআঁকিবুঁকিদিচ্ছে।হামিদএকদৃষ্টিতেতাকিয়েআছে, কিবলবেবুঝতেপারছেনা।মেয়েটিআগেরথেকেওনিচুস্বরেলজ্জাএবংবিনীতভাবেবলল ” যাবেন?” হামিদআড়ষ্টকণ্ঠেবলল “কোথায়যাবো?” “যেখানেনিয়েযেতেচান, সেখানেযাবো ।”হামিদঅন্যদৃষ্টিতেতাকালো।সেমেয়েটিকেমাপারচেষ্টাকরছে।কিধরনেরমেয়েবোঝারচেষ্টাকরছে।“আপনিচাইলেআপনারবাসায়যেতেপারি ।” – মেয়েটিরাস্তারএকপাশেসরেগেল।রাস্তায়হাতেগোনালোকজনেরআনাগোনা।হামিদওসরেএলো;…

Read more

Leave the first comment