অনুরাগ ॥ আশিকুল কায়েস ॥

অনুরাগ॥ আশিকুল কায়েস ॥অফিস শেষে বাসায় ফিরে সবেমাত্র ফ্রেশ হবো। এইমুহূর্তে মোবাইল ফোন ক্রিং ক্রিং করে বাজছে। তাকিয়ে দেখি একটা অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করবো কি করবো না সেটা নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। হ্যালো কে বলছেন? উপার থেকে বলল, আপনি কি কামাল সাহেব? আমি মিডফোর্ট হাসপাতাল থেকে বলছি। কথাটা শুনে মনের…

অনুরাগ
॥ আশিকুল কায়েস ॥
অফিস শেষে বাসায় ফিরে সবেমাত্র ফ্রেশ হবো। এইমুহূর্তে মোবাইল ফোন ক্রিং ক্রিং করে বাজছে। তাকিয়ে দেখি একটা অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করবো কি করবো না সেটা নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। হ্যালো কে বলছেন? উপার থেকে বলল, আপনি কি কামাল সাহেব? আমি মিডফোর্ট হাসপাতাল থেকে বলছি। কথাটা শুনে মনের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠলো। বিশেষকরে হাসপাতাল আর থানার কোন ফোনকল বেশিরভাগ মানুষের জন্য অমঙ্গলজনকই হয়ে থাকে। আর এই মুহূর্তে ফোনকল আসাটা নিশ্চয় মঙ্গলজনক হবে না। চাপা চাপা কন্ঠে বললাম হ্যা হ্যা বলুন-বলুন কি বলতে চান? তিনি বললেন, কয়েকজন লোক অসুস্থ এক রোগীকে ধরাধরি করে হাসপাতালে এনে বেওয়ারিশ বলে চালিয়ে দিয়েছে। বললাম, আমি কি করতে পারি? তিনি জানালেন, মানিব্যাগের মধ্যে কোন একটি কাগজে আপনার নাম্বারটা লেখা ছিল, আপনাদের কোন লোক কিনা সেটা সনাক্ত করতেই ফোন করা। কথাটা শেষ করে ভাবতে লাগলাম একবার দেখে আসলে কেমন হয়? নিশ্চয় পরিচিতদের মধ্যে কেউ হবে। আমার আবেগটা একটু বেশি, অধিক পরিচিত হলে আবার নিজেকে সামলাতে পারবো না। আমি হন্তোদন্ত হয়ে ছুটে গেলাম হাসপাতালে, কোথায় কোন লোকটা? জরুরি বিভাগে জিজ্ঞাসা করতেই অবজার্ভেশন রুমে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। সেখানে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন ডাক্তার তাকে ঘিরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। রোগীকে দেখার স্পৃহাটা নিজের মধ্যে বেশ কাজ করছিল, আর সৃষ্টিকর্তার নামটা একটু বেশি করে জব করছিলাম। কে ডাক্তার আর কে সাধারণ মানুষ সেটা দেখার সময় আমার হাতে একদম নেই, আমি কয়েক ডাক্তারকে ঠেলে সামনের দিকে জোর করে এগিয়ে যেতেই এক ডাক্তার চেচিয়ে উঠলেন, আপনি কে মশায়? আপনিতো খুবই অদ্ভূত লোক দেখছি, জানেন কার চিকিৎসা করছি? রোগীর কিছু হয়ে গেলে আমাদের আর চাকরি থাকবে না। মিডিয়া একেবারে তোলপাড় করে ছেড়ে দেবে। আমি সেই ভাগ্যবান মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে হতোভম্ভ হয়ে গেলাম। সবুজ কাপড়ে আটকানো দেহটিকে দু হাতের তালুতে জড়িয়ে মুখে একবার চুম্বন করলাম, হৃদয়ের গহীনে আটকে থাকা কান্না চিৎকার করতে চায়। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না- ওরে তোরা কে কোথায় আছিস? এযে আমাদের শিমুল ভাই। জগতে তার থেকে ভালো মানুষ আমার চোখে আর দ্বিতীয়টি পড়েনি। কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো কিভাবে? সে প্রশ্ন খোঁজার সময় আমার নেই। আশপাশের পরিচিত লোকদের ফোন করে জানিয়ে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই হাসপাতালের ক্লোকসিবেল গেটে ভীড় জমে গেছে। ভাইকে একনজর দেখার জন্য মানুষের চিৎকার চেচামেচি চলছে, তাদের শান্ত করার জন্য কর্তব্যরত আনসার বাহিনীর সদস্যরা রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে। ডাক্তার বলছিল কিছু সময়ের মধ্যে তার জ্ঞান ফিরতে পারে। তবে আইসিইউতে দ্রুত নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আইসিইউ বিভাগটা রোগীদের জন্য শেষ চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সেখান থেকে জীবিত অবস্থায় খুব কম রোগীই ফিরে আসে। ভাইকে দেখেছিলাম মিটিমিটি করে তাকাতে, আমাকে তার পাশে দেখে মৃদুভাবে হাসার চেষ্টা করলেন। আমার হাতের উপর হালকাভাবে হাত রাখার চেষ্টাও করছেন। আমি নিজের হাতটা প্রসারিত করে চেপে ধরে বললাম শিমুল ভাই আমি আছি আপনার পাশে কোন সমস্যা নেই। তিনি খুবই অসহায়ত্ব অবস্থায় অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। নিজের কানটা সজাগ করে তার মুখের বেশ কাছাকাছি নিলাম, তিনি ফিসফিসিয়ে বললেন বাড়ীতে যেন কোনভাবেই খবরটা না জানায়। তার কারণ জানার মত অতোটা সাহস আমার ছিল না, তারপরও মায়াভরে আমার দিকে আর একটিবার তাকায়, তাতে বুঝে যায় শিমুল ভাইয়ের করুণ আর্তণাদের চিত্র কিভাবে চোখের মনিতে খেলা করছে। নিজের ভাইদের থেকেও শিমুল ভাইকে আমি কম দেখিনা। তার কাছ থেকে কোনকিছু প্রাপ্তির বিষয়টা না তুললেও অবস্থানগত ক্ষেত্রেও তিনি আমার চোখের মনি। তিনি আমার জন্য একটি মাইলফলক, আর দিয়েছেনও অনেক। যার ঋণ কোনদিও শোধ করতে পারবো না। তার সেবা করার সামান্যটুকু সৌভাগ্য আমার হচ্ছে, এই সুযোগটাও কোনমতে হাতছাড়া করতে চায়নি। মানুষটা সারাজীবন মোমের পুতুলের মতো সবাইকে দিয়েই গেলেন, বিনিময়ে কোনদিন কিছুই চায়নি। আমার কাছে তিনি এতটুকু অনুরোধ করেছেন আমি রাখতে পারবো না সেটা কি হয়? বিকেল হলে হাসপাতালে রীতিমত ভক্তদের ভিড় জমে ওঠে। কখনও কখনও সেই ভিড়ের মধ্যে ভক্তদের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে হাফসে উঠি। হাসপাতালে ২দিন পার করে ফেলেছি কিন্তু ভাইয়ের কোন অগ্রগতি নেই। আজিম ভাইয়ের খুবই কাছের লোক। সে আজ হাসপাতালে থাকতে চায়, তাই আমাকে জোর করেই বাসায় পাঠিয়ে দিল। বলেছিল কামাল ভাই আপনার চোখের কোণে কালো দাগ পড়ে গেছে, তাছাড়া আপনি ভাইয়ের পাশ থেকে পর্যন্ত নড়েননি, আজ আপনি বিশ্রাম নিন। বাসা থেকে প্রস্তুতি নিয়ে কাল আসেন, আমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত এখানেই থাকবো। আমি ভাইকে ছেড়ে কোনভাবেই আসতে চায়নি, তারপরও আগামীদিনগুলোতে ভাইয়ের পাশে থাকার জন্যই নিজেকে তৈরি করতে আজিমের অনুরোধে বাসায় আসি। রাতে কোনভাবেই ঘুম হচ্ছেনা, শুধুই কি পায়চারা। আজিম, রাইসুল, পিয়াস, হৃদয় সবাইকে ফোন দিয়ে মিনিটে মিনিটে শুনছি কি অবস্থা। আবার মনে হচ্ছে এখনই রওনা দিই হাসপাতালে। ভাইয়ের পড়ার টেবিলের দিকে তাকালে বড্ড খালি খালি লাগে। তার অবর্তমানে টেবিলে ময়লা জমে গেছে। তিনি থাকলে কোন কোণে এতটুকু ময়লা জমে থাকার সুযোগ হয়তো থাকতো না। একটুকরা কাপড় নিয়ে এগিয়ে গেলাম টেবিলের দিকে। টেবিলের উপর রাখা কিছু বইয়ের সারিগুলোও বেশ এলোমেলো। ভাই কোনদিন বিশৃঙ্খল পছন্দ করতেন না। বইয়ের সারিগুলো বলে দিচ্ছে তিনি না থাকাতে তারা কতটা খুশিতে আছে। আমি বইয়ের সারি ঠিকঠাক করে সাজাতে যেতেই বইয়ের মধ্য থেকে ছোট্ট একটা ডাইরি মাটিতে পড়ে যায়। ডাইরি হাতে তুলে নিলাম, প্রথম দিকটা খুলে ভেবেছিলাম এটা কোন নতুন গল্প হবে। তাই প্রকাশিত হবার আগেই নতুন গল্প পড়ার স্বাদটা কোনভাবেই মিস করতে চায়নি। রাতে সময় কাটাতে এনার্জি লাইটটা জ্বালিয়ে চট করে শুয়ে পড়লাম ডাইরি নিয়ে।
“বড় ভাইয়ের হাত ধরে সেদিন ছিল আমার জীবনের প্রথম ফুল প্যান্টের স্কুল যাত্রা। হাফ প্যান্টের গণ্ডি পেরিয়ে সবার জীবনে কম বেশি ফুল প্যান্ট পরা স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি আমারও হয়েছিল। তবে স্কুলের শুরুর প্রথমটা সবার জন্য আনন্দদায়ক হলেও আমার কাছে ছিল খুবই অসস্থিকর। আনন্দ কি? খুবই ছোট বয়স থেকে হারিয়ে ফেলেছি, সবসময় মনে এক ধরনের ভীতি কাজ করতো, স্পর্ধ্যা দেখানোর মতো সাহস আমার মধ্যে কোনদিন কাজ করেনি। সত্যতা আর অভিষ্ঠতা ছিল আমার পরিবার থেকে শিখিয়ে দেয়া একমাত্র শপথের পথ। ব্যতিক্রম হলে দুঃশাসন ঘাড়ে চেপে বসার মত ভয় পৃথিবীতে আর কোথাও ছিল বলে আমার মনে হয় না, এমনকি কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রকেও হার মানায়। আমি ঐ দণ্ডের সম্মুখে খুবই কম সময় পড়েছি, চোখের সামনে ধুকে ধুকে অসহ্য যন্ত্রণায় কুকড়ে যেতে দেখেছি আমার বড় ভাইকে। সেখান থেকেই শিক্ষা নিয়েছি আর ভয় সেটাতো সাধারন বিষয়। পরিবারের চাপে বুঝতে বাধ্য হয়েছিলাম পড়ালেখার কোন বিকল্প নেই, স্কুলে গিয়ে পেয়েছি স্যারের বেত্রাঘাতের শিক্ষা। ভালোবাসার মাত্রা আমার জীবনে এতোটাই নিম্নস্তরে অবস্থান করছিল যে, জিরো থেকেও নগন্য। যেদিন আমার জীবনের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সূচনা হয় সেদিন থেকেই নিজের মধ্যে একটা ঘিন-ঘিন ভাব বিরাজ করে, আর মনে হয় সারাজীবন কি এভাবেই পড়ালেখা করে যেতে হবে? কোনদিন কি পরিত্রাণ হবার নয়? কেউ কি ভালোবেসে কাছে টেনে নেবে না? জন্ম কি হয়েছে শুধু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে আঁধারকে ভেদ করে বেরিয়ে যাবার জন্যে? কথাটা বললে যে ভুল হবে তা নয়, শ্রেণী কক্ষে বসে আমার বন্ধু জিয়া আঙ্গুল উঁচু করে একটি মেয়ের দিকে তাক করে বলেছিল- ঐ যে রূপ লাবণ্যে ভরা মেয়েটিকে দেখছিস, ওকে চিনিস? আমি মাথাটা বা থেকে ডানে ঘুরিয়ে সহজে বলে দিয়েছিলাম, নাতো। কিসে পড়ে? ও আমার মাথায় হাতের টক্কানি দিয়ে বলেছিল, ওরে গাঁধা ওতো আমাদের সাথেই পড়ে। ও তোর আপু হয়? কথাটা শুনে আমিতো আকাশ থেকে পড়লাম। ক্লাসে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার চেষ্টাও করতাম। মেয়েটির নাম ছিল তুলি। তার আকৃতিতে যে রূপের কথা বলে, রং তুলি দিয়ে আঁকা শ্রেষ্ঠ ছবিকেও হার মানাবে। সম্পর্কের জেরে ওকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। ছাত্রী হিসেবে ছিল অসাধারণ। চোখের দেখায় সে যতদূর অবস্থান করতো আমি ওর দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতাম। আমি জানি আমার এই অস্বাভাবিক ভঙ্গিমাটা সেও মাঝে মধ্যে লক্ষ্য করতো। তাকে নিয়ে আমি উপলব্ধি করতে শিখেছিলাম- ও আমার আপু হওয়া সত্বেও, পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি আছে যে আমায় শাসন করে না। ভালোবাসার জন্য লাগামহীনভাবে ছুটেছিলাম তাকে জয় করতে। বোনের প্রতি আমার ভালোবাসার প্রগঢ়তা এতোটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে, নিজের অস্তিত্বকে ভুলে তার জন্য আমার জীবনটা বিলিয়ে দেওয়ার সুযোগ খুঁজেছিলাম। কাল্পনিক হলেও সত্য নিজের আপন বড় আপুর মতো তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি কখনও ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাকে দূর থেকেই দেখে গেলাম। জীবনে একবারের জন্য আপু বলেও ডাকতে পারিনি। কতটা দিন কতটা সময় আর কতটা সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি তাকে মুখের ডাকা একবার আপু বলবো বলে। পাঁচ বছর অতিবাহিত করে ফেলেছি, সেও আমায় একবারের জন্য কাছে ডাকেনি, আর বলেওনি পরাণ ভরে আপু ডেকে নে। আমি তাকে মনে প্রাণে ভালোবাসতাম, এই ভালোবাসার সঠিক মর্যাদা দিয়ে ও যদি স্কুল জীবনে আমার পাশে এসে দাঁড়াতো তাহলে ভালো ছাত্র হওয়ার সুযোগ হয়তো আমার হতো। কিন্তু যেটা স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।
আমাদের বাড়ীর পরিবেশের সাথে মেয়ে মানুষের সম্পর্ক ছিল একদমই বেমানান। সম্পর্ক যাইহোক না কেন! সেটার সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে চৌদ্দটা বাজানোর পক্ষে ছিল আমাদের বাড়ীর মানুষের স্বভাব। কিন্তু আমার মধ্যে যে ভালোবাসার শূণ্যতা কাজ করতো সেটা কখনও কেউ অনুভব করেনি। উপরোন্তু ভালোবাসার জন্য কারোর কাছে ধরনা ধরলে করুণা দেখিয়ে কেউ কাছে টেনেও নেয়নি। বারবারই পাটা পুতার মাঝে পরে চেপ্টা হয়েছে নিজের ভাগ্য। ধিক্কার সেই ভাগ্যকে, যে ভাগ্যে মানুষের ভালোবাসা জোটেনা, জোটে শুধু ক্ষণিকের জন্য একটু করুণা।
সময়ের পরিক্রমায় ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে আঁধারকে ভেদ করে আলোকিত সময় দেখতে শুরু করেছি মাত্র। সমাপ্ত করেছি শিক্ষাজীবনের শেষতম অধ্যায়। একটি মানুষের অপেক্ষায় থেকেছি বছরের পর বছর কিংবা যুগের পর যুগ। যে কান্না এতো দিনে কেউ শুনেনি, যে গ্লানি কেউ অনুভব করেনি আর ভালোবাসার অপূর্ণতার খবর কেউ রাখারাও সময় পায়নি সেটা পূরণ হবে একদিন। কতটা বুক বাঁধা স্বপ্ন নিয়ে চললে জীবনের ২৬টি বছর পার করা যায়। তাকে ঘিরে সকল অপূর্ণতা পূর্ণতায় ভরিয়ে নেবো এই আশায়। পৃথিবীর কোন শক্তি আমায় বাধা দিতে পারবে না। আর বাধা দিলেও বা আমার কি আসে যায়, সম্পর্কের বন্ধনতো আর ছিন্ন করা যায় না। এসম্পর্ক যে আত্মীক সম্পর্ক। আমি হবো তার আদর্শে গড়া বিনম্র ও পৃথিবীর সুখময় সাধনাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। এতোদিনে পরের ঘাড়ে চেপে যে অভাবটুকু পূরণ করার চেষ্টা করেছি সেটা বিফলে গেলেও আমার স্বপ্ন সাধনা নিমেষেই এখন ধরা দিতে বাধ্য। তার কোলে মাথা রেখে আনন্দে খুনসুটিতে মাতবো, দুষ্টুমি হবে আমার দূরন্তপনা। পৃথিবীর সমস্ত আদর ভালোবাসা আর স্নেহসিক্ত হাতের ছোয়া আমার উপর এসে ভর করবে। তার শিখিয়ে দেওয়া হাসি, শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো তোতা পাখির মতই নতুন করে বলতে শিখবো। ও যে আমার জীবনের একটা আরাধনা মাত্র। প্রতিদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ব্যর্থ হওয়া সফলতা এবং জমিয়ে রাখা একটু একটু স্বপ্ন সবকিছুই সাফল্যে পরিণত হবে। ভালোবাসায় মায়া-মমতায় পরিপূর্ণ এক সাগর, অনন্তহীনা হৃদয়ের স্পন্দন সেই ব্যক্তি যার উপর আমি নিজেকে সপে দিয়েছিলাম। আমার মতো করে নয় বরং সবসময় চেষ্টা করেছি তার মতো থাকতে। তাকে আমি আমার কেন্দ্রস্থল ভাবতে শুরু করেছি, একমাত্র আশ্রয়স্থল যেটার বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার মত পরিণত বয়সে ছোটদের মত আচরণ একদমই মানায় না। ভালোবাসার সন্ধিক্ষণ পার করে এসেছি অনেক আগেই সেটা বোধহয় বেশিদিন হলোনা বুঝেছি। আমার কাছে যেটা ভালোবাসা তার কাছে সেটা অসহ্যজনক কি না সেটার কারণ আমি কখনও খুঁজার চেষ্টা করিনি। তারপরও আমার আশ্রয়স্থলতো সে। কিন্তু সে আমায় নিয়ে ভাবুক আর নাই ভাবুক ঐ ব্যক্তিটাই যে আমার ভাবনার একমাত্র কারণ সেটাতো আর অস্বীকার করা যায় না। দীর্ঘদিন আমার সাথে কথা বলে না, কথা বলার চেষ্টাও করে না। আমার প্রতি তার অন্তরে মায়া মমতার ততোটা দৃশ্যমান হলেও আমার সাথে যেভাবেই হোক কথা বলার চেষ্টা করতো। আর প্রতিদিন আমাকে একবার করে ভাবলেও বা কি আসে যায়, সেটা আমার জন্য যথেষ্টও নয়। কতটা দিন কতটা সময় যে তার পিছু ভিক্ষুকের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি একটু আদর, স্নেহ, ভালোবাসা পাবো বলে। স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজেকে আন্দোলিত করেছি, জোর করে হলেও একবার ভাবতে চেষ্টা করেছি পৃথিবীর মধ্যে আমিই একমাত্র সুখি ব্যক্তি। অসুখি হবার কোন কারণও নেই, কারণ তার চিন্তা চেতনায় আমি না থাকলেও আমার চিন্তার ব্যক্তি একমাত্র সেই ব্যক্তি, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমার মধ্যে তার জন্য যে কষ্ট ভর করে সেটা বুঝি তার মধ্যে করে না। তারপরও আমি তাকে অনেক অনেক এবং অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি যেদিন বুঝেছিলাম আমাকে ভালোবাসতে তার পায়ে পড়েছে লোহার শিকল। সেদিন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল বুকের পিঞ্জর। মায়া-মমতায় ঘেরা এ পৃথিবীতে আমার মত ছেলের স্নেহের যোগ্যতা যে রাখেনা সেটা খুবই স্পষ্ট। সবার কপালে সুখ শোভা পেতে নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা পেয়েছি যেটা আমার না অযথা আমার আমার করে কি লাভ! আর এখন শিক্ষা পেলাম আমার সব থাকা সত্ত্বেও কেউ আমার না। আমি যে হলাম অভাগাদের মধ্যে বড্ডই হতোভাগা। তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়ে নিয়েছি। আর জানিয়ে দিলাম গুড বাই পৃথিবী, গুড বাই পৃথিবীর ভালোবাসা।”
শিমুল ভাইয়ের লেখাগুলো পড়ে মনে বড্ড কষ্ট হতে লাগলো। লেখটা তার নিজের কোন অপ্রকাশিত জীবনের গল্প। বুঝতে পারলাম কতটা কষ্ট চেপে তিনি আমাদের মাঝে একটা সাধাসিধে মানুষ হয়েছিলেন। প্রায় একমিনিট চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর সকলস্তরের ভালোবাসার মানুষদের ঘৃণাভরে ধিক্কার দিতে লাগলাম, আর বলতে লাগলাম দরকার নেই এমন করুণার মতো ভালোবাসার। একটিবারের জন্য ভাবতে চেষ্টা করলাম, আমিও অভাগাদের মধ্যে একজন, কিন্তু শিমুল ভাইয়ের মতো অতোটা হতোভাগা নই, কারণ আমার চেয়ে বড় ভাই কিংবা ভাবি নেই। টানা দুইদিন যাবত হাসপাতালে কেয়ারে চলছে তার চিকিৎসা। কাছের মানুষদের কোন খোঁজ খবর পর্যন্ত পেলাম না। তাকে নিয়ে পরিজনদের মধ্যে আসলেই কেউ ভাবেনা সেটা উপলব্ধিতে আনার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম এই যদি হয় শিমুল ভাইয়ের মনের অবস্থা! তাহলে সত্যি সত্যি গুড বাই বলতে আমারও ইচ্ছে হয়। ভাবতে কষ্ট হলেও তাকে চোখের কোণে দুফোটা জলকণার সম্মান জানিয়ে সারথি হয়ে বিদায় দেবো আমিও। আর আমিও বলবো গুড বাই পৃথিবী, গুড বাই পৃথিবীর ভালোবাসা।

সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ

Related posts

সরকারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে তাদেরই ছাত্র সংগঠন || আশিকুল কায়েস ||

সময় এসেছে শিক্ষার্থীদের উপর অভিভাবকদের অভিভাবকত্ব ফলানো। উচ্চ শিক্ষার নামে আপনার ছেলে বা মেয়ে কি করছে ভেবে দেখেছেন কি?? কখনও…

Read more

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে করণীয় ও কতিপয় পরামর্শ ।। আশিকুল কায়েস ।।

শিক্ষা জাতীর মেরুদন্ড। সেই শিক্ষার মেরুদন্ড যদি মেরুকরণের আগেই ভেঙ্গে যায় তাহলে দেশে মেধা শূণ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় বেশি। উন্নত…

Read more

মারশাফির সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে মহানুভবতার শিক্ষা নিতে বড্ড ইচ্ছে করে ।। আশিকুল কায়েস।।

মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে লেখার কোন ভাষা এলে তা সবসময় এড়িয়ে চলি। বরাবরই মনে হয় অমন গুণেভরা ব্যক্তির সম্পর্কে বলতে…

Read more

Leave the first comment