মারশাফির সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে মহানুভবতার শিক্ষা নিতে বড্ড ইচ্ছে করে ।। আশিকুল কায়েস।।

মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে লেখার কোন ভাষা এলে তা সবসময় এড়িয়ে চলি। বরাবরই মনে হয় অমন গুণেভরা ব্যক্তির সম্পর্কে বলতে গিয়ে যদি কিছু বিয়োগ করে ফেলি এজন্য কলমটা থেমে থেমে যায়। একটা সময় ছিল যখন তাকে খুব কাছের থেকেই দেখতাম। তাছাড়া তার সম্পর্কে অতটা বিদ্যেটুকুও আমার মধ্যে ছিল না। ২০০৬…

মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে লেখার কোন ভাষা এলে তা সবসময় এড়িয়ে চলি। বরাবরই মনে হয় অমন গুণেভরা ব্যক্তির সম্পর্কে বলতে গিয়ে যদি কিছু বিয়োগ করে ফেলি এজন্য কলমটা থেমে থেমে যায়। একটা সময় ছিল যখন তাকে খুব কাছের থেকেই দেখতাম। তাছাড়া তার সম্পর্কে অতটা বিদ্যেটুকুও আমার মধ্যে ছিল না। ২০০৬ সালের কথা, এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কম্পিউটারের প্রশিক্ষণের সুবাদে আমি নড়াইলে থানা মোড়ের যুব কম্পিউটারে ভর্তি হই। থাকতাম নড়াইলে মামা বাড়িতে। কতরাত সাজ্জাদ চেয়ারম্যান নানার সাথে ঘুমিয়েছি। আহা তখনকার দৃশ্যপট একেবারে ফ্রেমে বাধিয়ে রাখার মত, উনি এখন আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী। যাইহোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক পল্লব স্যার ও সাজু স্যার আমার ডিরেক্ট টিচার। ঠিকমত পড়াশোনা না করার অপরাধে তাদের কাছে কত মার খেয়েছি। শাস্তিস্বরূপ বেশিরভাগ সময় কান ধরিয়ে দাড় করিয়ে রাখতেন প্রতিষ্ঠানের সামনে প্রধান সড়কে। ঐসময়টাতেই বিখ্যাত নাম মাশরাফি বিন মর্তুজার সাথে পরিচয়। প্রায় সময় দেখা হতো, কখনও সখনও দেখেছি আমার সামনে তার ভাগনির সাথে আনন্দে মেতে থাকতে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সামনে খালি জায়গাতে দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি আরও কত কি ! মজা পেতাম তাদের খুনসুটি দৃশ্য দেখতে। সাথে যোগ দিতেন পল্লব স্যারও।কখনও কখনও আমার দিকে করকটভাবে তাকিয়ে স্যার বলতেন, কিরে আজ সকালে পান্তা ভাত খেয়ে এসেছিস নাকি? সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকতে পারিস না? বলতে পারেন এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপটের কারণে আমি প্রতিদিনের পড়াটা অপ্রস্তুত করতাম। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মাঝে আমার মধ্যে ভালোলাগা তৈরি হতো। বরং ছোটদের সাথে মারশাফির খেলাধুলা করা আর আনন্দে মাতিয়ে রাখার দৃশ্যে দর্শক হয়ে দেখতে বড্ড ভালো লাগতো। কম্পিউটারের প্রসেসর লাগানো প্রাকটিক্যালে উল্টা লাগাতে গিয়ে ধাতব তারগুলো বেকিয়ে ফেলি। স্যার ধমকিয়ে বললেন সবাই যেভাবে সেট করে একটু লক্ষ্য করতে। সর্বশেষ আমার নিকট জিজ্ঞাসা করেছিল আশিক কিভাবে লাগাতে হয়? আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় বলেছিলাম ফুটোর মধ্যে সোজা করে ধাতব তারের অবস্থান হলেই লেগে গেল।কথাটি শুনে সবাই হাসতে হাসতে দম বেরিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। দরজায় দাঁড়িয়ে ম্যাশও হাসছেন। লজ্জাও পেয়েছিলাম বেশ।স্যার আমাকে ফুটো সম্পর্কে বিদ্যে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আর তাতে আমার বুঝতে বাকি রইলো না নড়াইলে ফুটো শব্দটা যায় না। এটা সবার কাছেই একটা লজ্জাজনক। শিখেছিলাম ফুটোর আর এক নাম ছিদ্র। বুঝেন তাহলে কি ধরনের গর্ধব ছাত্র ছিলাম। হঠাৎ একদিন দেখি আমার পরিচিত কেউ একজন মারশাফির দিকে এগিয়ে আসছে। চেহারাটা ক্রমশ পরিস্কার হতেই দৌড়ে আমাদের তিন নম্বর রুমে পালায়। ম্যাশের নাম ধরে ডাকতেই তিনি তার সাথে বেরিয়ে যান। দেখে মনে হয় একেবারে গলায় গলায় প্রীত। ব্যাক্তিটি আমার মামা হন। তার নাম সাব্বির। তার বড় ভাই মুরাদ আমাকে এখানে ভর্তি করেছিলেন, সাব্বির মামা পড়াশোনা বিষয়ে খুব খোঁজ খবরও নিতেন। মনে ভয় তাড়া করে মামা যদি আমার এহেন কর্মকাণ্ডের কথা জানতে পারেন তাহলে আস্ত রাখবেন না। এদিকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আর গর্ধবের প্রমান দিতে দিতে হয়তো ম্যাশের চোখে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছি। বিষয়টি আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। এরপর থেকে ম্যাশকে দেখলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। সাজু স্যারের কাছে শুনি এই বাসাতেই মারশাফির আবাসস্থল।আর এই বাড়ির কিছু অংশ নিয়েই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই যা ! হাড়ির মধ্যেই চাল হয়ে ফুটছি একথাতো জানতাম না।অপেক্ষায় ছিলাম কবে তাড়াতাড়ি শেষ হয় এই প্রশিক্ষণ।যত দ্রুত সম্ভব মামা আর নানাদের ভয়ে আমি নড়াইল ছেড়ে আমার নিজ জেলা মাগুরা থেকে সপ্তাহে ৪ দিন স্যারের অনুমতিক্রমে ক্লাসে আসতাম। গাড়ীর পথ আসতে খুব বেশি সময় লাগতো না। তবে ঘন্টা ২ তো বটেই। আমার কষ্ট করা দেখে স্যার আমাকে আর শাস্তি দিতেন না। সাহস বেড়ে গিয়েছিল। সাজু স্যারের সাথে রান্না ঘরে গিয়েও ম্যাশদের বানানো রুটি চুরি করেছি। চুরি করে খাওয়ার আনন্দ ধরতো না।রুটি প্রতিদিনই সম্ভবত ম্যাশের ভাগ্নির জন্য বানানো হতো। মারশাফির ভাগ্নিটা তুলনায় অনেক মোটাসোটা। তখন সম্ভবত দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। দেখে বুঝার উপায় নেই। মনে হতো ক্লাস এইটে পড়া মেয়েটি মোটা প্রতিযোগিতায় প্রথম হবার জন্য সামনে যা পায় তাই খায়। আসলে বিষয়টি তা নয়, ঐ মেয়েটার একমুঠো ভাত খাওয়ার কত আর্তনাদ আমি শুনেছি। ডায়েট কন্ট্রোলের জন্য ওর মা ওকে ভাত দেওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল। একেবারে এবেলা আর ওবেলা ১টা থেকে ২টা রুটি। একেবারে জেলখানার পুরানো নিয়ম। ওর সাথে খেলাধুলা আর কম্পিউটারের গেম প্রতিযোগিতা করার অভ্যাস আমারও ছিল। ভুল করেও আর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মত অপরাধ করতাম না। কেননা মামাদের বেশ ভয় করে চলতাম বিধায় সবসময় মনে হতো একটা মাছের কাঁটা গলায় বিধে আছে। সাব্বির, বিপুল, ফরহাদ, মুরাদ মামার ভয় আর ইমরান মামাতো আছেই। বক্তিয়ার চেয়ারম্যান নানা, লিয়াকত নানাকে খুব বেশি ভয় হতো না। তবে সাজ্জাদ চেয়ারম্যান নানাকে একটু একটু ভয় পেতাম। আবার কখনও সখন তার সাথে একই খাটে ঘুমাতাম। কথায় কথায় আমাকে লিয়াকত নানা চুদুর ভাই-চুদুর ভাই বলে ডাকতো। আমি শুধু লজ্জায় মুখ আটকাতাম। আর ঐ শব্দটা শোনার জন্য আমি সবসময় অপ্রস্তুতই থাকতাম। যা প্রতিটি সময় প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিত।ভালোও বাসতেন খুব। এখন বুঝতে পারি তারা ছিল চুদু আর আমি ছিলাম তাদের ভাই। কথাটা মনে পড়লে বড্ড হাসি পায়। ভয় ছিল যদি কোনদিন মারশাফি কথার ছলে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার কথা মামাদের বলে দেন। এটা আমার জানা ছিলনা সাব্বির মামা মারশাফির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাছাড়া আমার সকল মামাদের সাথে উনাদের উঠাবসা। একপ্রকার বলায় যায় চক্ষু লজ্জার ভয়ে আমি মামাদের বাড়ীতে থাকা ছেড়েই দিই।

২০০৮ এ আমি উচ্চশিক্ষা নিতে ঢাকায় আসি। জেলখানার সামনে নাজিমুদ্দিন রোডের সাব্বির মামার বাসায় আমি গিয়েছিলাম। মামা বাধন মামাকে পিঠা আনতে পাঠিয়েছিলেন। বাধন মামা ৩৭ তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছে। খাবার সময় মামা বলেছিলেন কিছুক্ষণ পর মারশাফি বাসায় আসবেন আমরা যেন থেকে যায়। কথাটা শুনে আমার গলায় জল বাধার মত অবস্থা। পড়ি মড়ি করে সরে যাবার চিন্তা সেদিনও ছিল। তাড়াহুড়া করে কি কারণে কেটে পড়েছিলাম সেটা বোধকরি আমি ছাড়া সেখানকার কেউ অবগত ছিল না। মারশাফি মানেই আমার মনে আতঙ্কের ঝড়। ২০১৫ সালের লেখক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে প্রস্তাব উঠে আসে মারশাফি বিন মুর্তজা ও মো. আশরাফুলের নাম। এত প্রস্তাবের মুখে আমি সেদিন না করতে পারিনি। ঐ অনুষ্ঠানের সময় খেলার কারণে তারা দুজনেই দেশের বাইরে ছিলেন। অনুপস্থিত থাকাটা আমার কাছেই একপ্রকার ছিল স্বস্থিকর আনন্দের। আমাদের পরিষদের ম্যাগাজিনের উপদেষ্টা হিসেবে তার কাছে প্রস্তাব যায়। তিনি বলেছিলেন বিসিবির কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমাদের উপদেষ্টায় থাকতে পারছেন না। তবে আমাদের সাথে আছেন সবসময়। নীরবে আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু নির্দেশনা দিলেন। তিনি আরও বললেন তাকে ডাকলেই সবসময় আমরা পাশে পাবো। আমার প্রতি তার নির্দেশনা শুনে আমি সেদিন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপরও মনের মধ্যে কিছু একটা ভয় কাজ করে, যদি চিনে ফেলে আমায় তাহলে মামা আস্ত রাখবেন না। তাদের মত হাইসোসাইটিতে আমাকে নিয়ে গর্ধব বলা ছাড়া গর্ব করার কিছু থাকবে না। পরিষদের ছোট ভাই রাইসুল ম্যাশের জন্য পাগল, সবসময় আমায় উতলা করে কবে তার সাথে দেখা করতে নিয়ে যাবো। কিন্তু আমি তাকে ছোট বাচ্চাদের মত ঘুম পাড়ানোর মত কথা বলি। 

বসুন্ধরা সিটির এককোটি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে হাসপাতালের জন্য এ্যাম্বুলেন্স নেয়ায় আজ মানুষটাকে নিরবে সম্মান করে যাচ্ছি। তার সামনে গিয়ে আবারও নতুন করে কান ধরতে ইচ্ছে করে। তার কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। মারশাফিকে শিক্ষক মেনে এমন মহানুভবতার শিক্ষা কান ধরে শিখতে বড্ড বেশিই ইচ্ছে করে।

Related posts

সরকারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে তাদেরই ছাত্র সংগঠন || আশিকুল কায়েস ||

সময় এসেছে শিক্ষার্থীদের উপর অভিভাবকদের অভিভাবকত্ব ফলানো। উচ্চ শিক্ষার নামে আপনার ছেলে বা মেয়ে কি করছে ভেবে দেখেছেন কি?? কখনও…

Read more

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে করণীয় ও কতিপয় পরামর্শ ।। আশিকুল কায়েস ।।

শিক্ষা জাতীর মেরুদন্ড। সেই শিক্ষার মেরুদন্ড যদি মেরুকরণের আগেই ভেঙ্গে যায় তাহলে দেশে মেধা শূণ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় বেশি। উন্নত…

Read more

তোমাকে বড্ড ভালোবাসি “মা” ।। আশিকুল কায়েস ।।

আর মাত্র কয়েকটি দিন। তারপর তোমার সমস্ত দুঃখ শেষ। ছোটবেলায় খিদের যন্ত্রণায় ছটফট করেছি, একটু ভাত দাও ভাত দাও করে…

Read more

Leave the first comment