এইতো সেদিন ইংরেজি স্যারের নিকট প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ছেলেমীপনার কারনে এক সহপাঠীর সাথে হাতাহাতি করেছিলাম আর তাতে বেশি ক্ষতি বোধহয় আমারই হয়েছিল।প্রাইভেট না পড়ে বাড়িতে এসে নিজের বেডের উপর উপুড় হয়ে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদতেছিলাম। আম্মু সেটা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসে, আমায় ধমকে বলেছিল পুরুষ মানুষ হলে মার খেয়ে ফিরে আসতি না। পুরুষত্বের পরিচয় দিতে একটি লাঠি হাতে ধরিয়ে রাস্তায় পাঠিয়ে দেয়। প্রতিশোধ নেবো এই আশায় আমার শত্রুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ছেলে বড় হয়েছে একাই পারবে, মেরে একেবারে রাস্তায় শুয়ে দেবে, সাহস আর রাগ উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের মত ফুসে উঠছে। প্রতিপক্ষকে কেউ বাচাতে পারবে না, আধো আধো অবস্থায় যাতে তাকে বাচিয়ে রাখা যায় ভেবে আমার চাচাতো ভাইকে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন আমার আম্মু। যাতে যথাসময়ে গিয়ে শিকারির সামনে থেকে আহত বস্তুকে উদ্ধার করতে পারে। সময় এসেছে ওর প্রতি আমার সমস্ত ক্ষোভ মেটাবার। আমার লাঠির সিগনাল পেয়ে শত্রুপক্ষের সাইকেল এসে থামল আমার সামনে, ও মার খাবার জন্য অপ্রস্তুত ছিল, বেশ ভিতকণ্ঠে আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমাকে মারবি নাকি? সাইকেলের সামনের চাকায় লাঠি দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট আঘাত করছি আর বললাম প্রয়োজন হলে তাই করবো। যেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে হাফডজন মানুষকে আঘাতের মাধ্যমে করুক্ষেত্র রচনা করা যায় ঠিক ততোটুকু সময় রাস্তা অবরোধ করে দাড়িয়ে আছি যুদ্ধ ছাড়াই। চাচাতো ভাই দৌড়ে এসে আমার হাতখানা ধরে বলেছিল মারিস না। মনে শক্তি বেড়ে গেল। আমাকে জাপটে ধরা অবস্থায় ছুটাছুটি করছি ও আরও বেশি গর্জে উঠলাম এমন ভাব নিলাম সামনে থাকা সমস্ত কিছু আমি লণ্ডভণ্ড করে দেবো। আম্মু রাস্তায় এসে দেখে আমি তার গায়ে একফোটা আচড় পর্যন্ত দেইনি। ওকে শাসিয়ে আমার আম্মু বলেছিল ছেলেটা আমার বড্ড ছোট ও কারোর গায়ে হাত তুলতে পর্যন্ত পারে না, তোর এমন কি বিবেক? তুই ওকে মারিস! এত সাহস পেলি কোত্থেকে? ওইদিন বুঝেছিলাম ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়লেও আমি বড় হতে পারিনি।
আমি ঢাকাতে এসে উচ্চশিক্ষাও শেষ করেছি। কত অন্যায় চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি, নিজেও তার স্বীকার হয়েছি। কিন্তু কারোর গায়ে হাত তোলার মত মানসিকতা আমার মধ্যে ভর করেনি, আমি পারি না। আমার দ্বারা ওটা সম্ভবও নয়। তবে কি আমি কখনও বড় হতে পারবো না? আর কত বয়স হলে আমি বড় হবো? মাথায় আসে না।
আজ চলতি বাস থেকে ছিনতাইকারি ছিনতাই করে দৌড়ে পালানোর সময় যখন তাকে তাড়া করার জন্য বেশকিছুলোক পিছু নিয়েছিল কিন্তু ধরতে পারছিল না, ঠিক সেই মুহূর্তে ছিনতাইকারী আমাকে অতিক্রম করার সময় নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি, পূর্ণ শক্তি নিয়ে পেটের তলদেশে লাথি মারতেই ছিটকে পড়ে রাস্তাই। লাথি মারার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম আমি বড় হয়ে গেছি, চিৎকার করে মাকে বলতে ইচ্ছা করে মাগো আমি বড় হয়ে গেছি। মা শুনতে পাবে কি আমার কথা? রাস্তায় এসে আমার জন্য তোমাকে আর কাউকে শাসাতে হবে না, আর বলতে হবে না আমার ছেলে বড্ড ছোট। আমি আশিক সেই আশিক নেইগো মা, আমি যে অনেক বদলে গেছি। সবাই আমাকে সম্মান করে, এখন কাউকে মারতে আমার হাত কাপে না, যেমন কাপেনি আজ। আমি তোমার ছেলে মা, অনেকের বাবা মা আমায় ভাগ নিতে চাই, বিশ্বাস করো মা তোমার ছেলে তোমারই থাকবে। আচরণ বদলে গেলেও তোমার ছেলে কোনদিন বদলাবে না। বিশ্বাস রাখো আমার প্রতি।


