টমির চন্দ্রাযাত্রা ।। জিনাত নাজিয়া ।।

১ম পর্ব পরবর্তী রাজার দুই পাশে দুই শিয়াল মন্ত্রী, বাঘ, হাতী, বানর, ভালুক, পংখীরাজ ঘোড়া ছাড়াও আরো আছে ছোট বড় অনেক পশু। বাঘ হলো রাজার প্রধান সেনাপতি। “তোমাদের মধ্যে সাহস করে কে চাঁদে যেতে পারবে, হাত তোল।” টমিকে নিয়ে অন্য কুকুরেরা সভায় একপাশে ঘাপটি মেরে বসেছিল, রাজার ঘোষণা শুনেই টমি দুই…


১ম পর্ব পরবর্তী
 রাজার দুই পাশে দুই শিয়াল মন্ত্রী, বাঘ, হাতী, বানর, ভালুক, পংখীরাজ ঘোড়া ছাড়াও আরো আছে ছোট বড় অনেক পশু। বাঘ হলো রাজার প্রধান সেনাপতি। “তোমাদের মধ্যে সাহস করে কে চাঁদে যেতে পারবে, হাত তোল।” টমিকে নিয়ে অন্য কুকুরেরা সভায় একপাশে ঘাপটি মেরে বসেছিল, রাজার ঘোষণা শুনেই টমি দুই হাত উপরে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি যাব” ওর সাথের কুকুরেরা ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অন্যসব পশুরা তাচ্ছিলের হাসিতে ফেটে পরল। কেউ-কেউ ওকে গৃহপালিত কুকুর বলেও ক্ষ্যাপাতে লাগল। রাজা নিজেও হাসতে লাগল। কিন্তু রাজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিয়াল মন্ত্রী টমিকে দেখে একটু ভয় পেয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, যখন এই কুকুরগুলো মানুষের বাড়ি পাহারা দেয় তখন আমরা কিছুতেই হাঁস-মুরগি চুরি করতে পারি না, ঘেউ-ঘেউ করে তেড়ে আসে। আজ যখন সুযোগ এসেছে তখন একে একটু শিক্ষা দিতে হবে।
“না না আমি চাঁদে যাব, কারন আমার পাখা আছে, তোমরা তো উড়তে পারবে না।” ওপাশ থেকে পংখীরাজ ঘোড়া চেঁচিয়ে উঠল। রাজা চিন্তিত হয়ে পরলেন। একটু নিচুকণ্ঠে সেনাপতির সাথে পরামর্শ চলতে লাগল। চারিদিকে চাপা গুঞ্জন। টমিকে কেউ পাত্তাই দিল না। কিছুক্ষণ পর রাজা হুংকার দিয়ে উঠল, “পংখীরাজ তুমি কেন যেতে চাও বল?”
“হুজুর আমার যেহেতু পাখা আছে, তাই আমার পক্ষে উড়তে সুবিধা হবে। অন্যদের পাঠাতে হলে ওদের নতুন করে পাখা বানাতে হবে। উড়ার জন্য ট্রেনিং দিতে হবে, তাতে অনেকটা সময়ও লেগে যাবে। তাই বলছিলাম আমি থাকতে অন্যরা কেন…” রাজার সামনে সাহস করে এত কথা বলে একটু ভয় পেয়ে গেল পংখীরাজ।
“ঠিক, ঠিক, ঠিক। খুবই খাঁটি কথা বলেছ। তুমি থাকতে অন্যেদের কথা আসছে কেন।” বলেই আবার টমির দিকে তাকিয়ে একটু তাচ্ছিলের হাসি হেসে রাজা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,আমাদের পংখীরাজ থাকতে এই গৃহপালিত ক্ষুদ্র জাতের কুকুর কেন, কি বল তোমরা?” টমির দিকে দাঁত খিঁচিয়ে রাজা আবারও হি হি করে হাসতে লাগল। অন্য সবাইও রাজার সাথে খুব হাসতে লাগল।
এদিকে রাজার পাশে বসে এতক্ষণ চালাক শিয়াল নতুন এক বুদ্ধি বের করল- যে করেই হোক পটিয়ে-পাটিয়ে টমিকেই পাঠানোর জন্য রাজাকে রাজি করাতে হবে। ওতো আর কখনো ফিরে আসতে পারবে না। এই সুযোগ! একটা কুকুরকে অন্তত শিক্ষা দেয়া হবে, সেই সাথে বোকা রাজারও যে বুদ্ধি কম সেটাও বোঝানো হবে। শেয়াল রাজার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “হুজুর এই কুকুরটাকেই পাঠাতে হবে”
“কেন?” রাজা হুংকার দিয়ে উঠল। শিয়াল রাজার কানের আরো কাছে গিয়ে বলল,
“আস্তে হুজুর, আস্তে কথা বলেন, আপনি কি জানেন F.B.I এবং C.I.D তে এদের জাত ভাইয়েরা থাকে। পুলিশেও এদের দলের কিছু ট্রেনিং দেয়া কুকুর আছে। আপনি যে চুপিসারে প্রতিদিন জংগল থেকে একটা একটা করে হরিণ সাবাড় করে চলেছেন, সেটা যদি এরা একবার জানতে পারে, তবে আপনার কি উপায় হবে ভেবে দেখছেন?”
“কিন্তু…” রাজা একটু চিন্তা করতেই শিয়াল আবার বলল,“হুজুর কোনো কিন্তু নয়, আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসাতেও এদের জাত ভাই আছে। তাই যে করেই হোক ওকেই পাঠাতে হবে। রাজা এবার একটু ভয় পেয়ে নড়েচড়ে বসল। গালে হাত দিয়ে চিন্তা করতে লাগল। কিছুক্ষণপর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “চুপ কর সবাই, টমিকেই চাঁদে পাঠাব” রাজার হুংকার সভার মধ্যে নিরাবতা নেমে এল।
আবারও সিংহরাজা বলতে লাগল, “টমির কোনো পরিবার নেই, তাই ওর কোনো পিছুটান নেই। তোমাদের সবার পরিবার আছে। চাঁদে গিয়ে মারাও তো যেতে পার, তখন তোমাদের পরিবারের কি হবে।” সভার মধ্যে চাপা একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। এদিকে টমি রাজার মুখে নিজের নাম শুনে খুশিতে নাচতে লাগল, যাক তবুও এতদিনে একটা ভালো কাজের সুযোগ পাওয়া গেল। জীবন চলে গেলেও এই পশু সমাজের প্রথম নভোচারী পশু হয়ে বেঁচে থাকতে পারব। কুকুরদের মাঝেও অমর হয়ে থাকার সুযোগ হবে। অনেক আগে শুনেছি ‘লাইকা’ নামে আমাদের এক জাতভাই পুরো পৃথিবী ঘুরে এসে আজো অমর হয়ে আছে। মরে গেলে অন্তত তার পাশেতো আমার নামটাও অমর হয়ে থাকবে। খুশিতে টমির মন ভালো হয়ে গেল। রাজার ঘোষণার সাথে সাথে অন্য কুকুরেরা চিন্তিত হয়ে পরল। কিভাবে টমিকে চাঁদে পাঠাবে। সবাই মিলে অনেক ভেবে ঠিক হলো, গ্যাসবেলুনের সাহায্যে টমির চন্দ্রযাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বেলুন পাবে কোথায়? একটা নভোচারীর পোষাক প্রয়োজন, পোষাক না হলে অন্তত একটা হেলমেটতো লাগবেই। সেটা কিভাবে? অনেক ভেবে ঠিক হলো, লোকালয়ের মানুষকে ভয় দেখিয়ে এসব যোগাড় করতে হবে। ওখানের সব জায়গাই টমির পরিচিত। রাজার অনুমতি নিয়ে ওরা কয়েকজন টমিকে নিয়ে চলে এল জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে। একটু দূরের পথে যাচ্ছিল এক বেলুন বিক্রেতা। চার-চারটি জংলি কুকুরের আক্রমণে লোকটি ভয় পেয়ে বেলুন ফেলেই পালিয়ে বাঁচল। একইভাবে যোগাড় করল একটি হেলমেট। খুশিমনে টমিকে নিয়ে ওরা চলে গেল রাজার কাছে। রাজা আর রাজার সেনাপতি মিলে একটা ভালো দিন দেখে টমিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে যাবার তারিখ ঘোষণা করল। ওর সাথে খাবার, পানি ও একটি বাংলাদেশের পতাকা দেয়া হলো।
রাজা টমির মাথায় হাত রেখে বলল, “পৌঁছেই পতাকা উড়িয়ে দিবে, তা না হলে রাশিয়া, আমেরিকা থেকেও অন্য পশুরা আমাদের জায়গা দখল করে নিবে। সাবধানে থাকবে। মনে রেখ তুমি ফিরে এলেই আমরা যাওয়ার ব্যবস্থা করব।” বোকা রাজার কথা শুনে শিয়াল মন্ত্রীরা আড়ালে মুচকি হাসল। টমি রাজাকে সালাম জানিয়ে বেলুন ধরে ঝুলে পড়ল। আস্তে-আস্তে টমি আকাশে উঠতে লাগল। সবাই ওকে হাসিমুখে বিদায় জানালেও টমির কুকুর বন্ধুরা ওকে বিদায় জানালো চোখের পানিতে। উপরে উঠতে-উঠতে একসময় টমি নামের গৃহপালিত কুকুরটি হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে, দূরে…বহু দূরে। রাজার পাশে দাঁড়িয়ে দুই চালাক শিয়াল কুটিল হেসে ভাবল, যাক অন্তত একটা কুকুরকেতো জনমের মত শিক্ষা দিতে পেরেছি।
।।সমাপ্ত ।।
লেখক : জিনাত নাজিয়া, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ

Related posts

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে মোহাম্মদ সোহেল এর কতিপয় পরামর্শ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের হাত থেকেরেহাই পেতে আমার চিন্তা বা ভাবনা উপস্থাপনা করছি।১.একটি বাক্সে প্রশ্নের সিলগালা খাম টি রাখা থাকবে।২.বাক্সের মুখ আধুনিক…

Read more

বিরহ যন্ত্রণা ।। মোঃ লোকমান হোসেন শিশির ।।

বিরহ যন্ত্রণায় ক্ষণিকের আনন্দ ঘনভূত আমার জীবনক্লান্ত-শিক্ত অশ্রু আমার খোঁজে কার আশ্রয়-ভূবন ঘুরিয়া নাহি পেলাম নাহি পেলাম সুখ,আহা বারবার টানে…

Read more

বর্তমান আমি ।। মেহেদি হাসান ।।

অতীত আমি গেছি ভুলিমনের সুখে নিরাই ইরি।মাটিতে হাঁটু ফেলিমাথাটা নিচু করিমাটিটা খামচি ধরিআগাছাগুলো ফেলছি তুলি।ক্লান্তি তখন আসে ঘিরিহারানো দিনের গানগাইতে…

Read more

Leave the first comment