সভ্যতার ইতিহাসে এমন মনীষী খুব বিরল যিনি সমালোচনা, কুৎসা-নিন্দা, গ্রহণ-বর্জনের ঘূর্নাবর্তে পতিত হননি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ব্যতিক্রম নন। পাক আমলে পূর্ববাংলায় তাঁকে নিয়ে যা কিছু ঘটেছে পৃথিবীতে তা নজিরবিহীন। ধর্মান্ধ, কট্টর জাতীয়তাবাদী, এমনকি প্রগতিশীল বামপন্থী শিবির থেকেও তাঁর প্রতি বিরোধিতার তীর নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কখনো স্তুতি, অতিবন্দনার পুস্পবৃষ্টিতে তিনি হয়েছেন ‘দেবতা’। কখনো গুরুদেবের বিশাল আস্তিনের নীচে তিনি ‘দূর আকাশের তারা’। তবে চূড়ান্ত বিচারে বলা যায়, বাঙালির সুখে-দুখে, জীবনযাত্রায়-প্রাত্যহিকতায় রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে আছেন অনিবার্য নিয়তির মতো।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর (১৯৪১) অনতিকাল পরই দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা, সাং¯ৃ‹তিক স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় সংহতির জন্য পাক নেতৃত্বের চোখে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিপজ্জনক রাষ্ট্রদ্রোহী। যদিও তাঁর নিন্দা করা যতটা সহজ তার সাহিত্য সমালোচনা ততটাই কঠিন। প্রতিক্রিয়াশীল পাক শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুচররা কুৎসা-নিন্দার সহজ অপকর্মটিই বেছে নিয়েছিল। প্রকৃতঅর্থে ‘পাকি আছর’ মুক্ত না হওয়ায় এহেন অপচেষ্টা আজও বিদ্যমান।
তৎকালীন দৈনিক আজাদ, দৈনিক পয়গাম, দৈনিক পাকিস্তান, মাহে নও প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় রবীন্দ্র বিষেদগারে শ’শ’ প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। যেগুলোর ভাব-ভাষা-উদ্দেশ্য ছিল অমার্জিত, রুঢ়, ধর্মান্ধতাপুষ্ট। রেডিও, টেলিভিশনে এমনকি বাংলা একাডেমীতেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিষিদ্ধ-অচ্ছুত।
একজন কবির কাব্যসমালোচনার পরিবর্তে তার রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, শ্রেণীচরিত্র মূল্যায়ন বা বিরুদ্ধতা কতটা সমীচীন সে প্রশ্নে না গিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দেখিঃ-
ক. তিনি প্রজাশোষক জমিদার।
খ. তিনি সাধারণকে উপেক্ষা করেছেন।
গ. তিনি ইংরেজদের পক্ষে ছিলেন।
ঘ. তিনি সাম্যবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন না।
ঙ. তিনি মুসলিম সম্প্রদায় ও কীর্তিকে উপেক্ষা করেছেন।
চ. তিনি পূর্ববঙে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন।
স্রষ্টাকে দেখতে-বুঝতে হয় তাঁর সৃষ্টিকর্মের আরশী দিয়ে, উপলদ্ধ চেতনার মধ্য দিয়ে। কথায় আছে, ‘‘সজ্জন গুণ খোঁজে, দোষ খোঁজে পামর’’। রবীন্দ্র সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই জানেন, বর্ণিত অভিযোগগুলো কতটা উদ্ভট, হঠকারী, ভিত্তিহীন, বালখিল্য। ‘দুই বিঘা জমি’ ,’ সামান্য ক্ষতি’বা ’আফ্রিকা’ কবিতাগুচ্ছ এসব অভিযোগের অসামান্য জবাব হতে পারে। জ্ঞান-শিক্ষার জন্য আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে শেষোক্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্টদের মানসিক দীনতা যা করুণার উদ্রেক করে। ইতিহাসবিদ ডিজি খানুলকার তার The Iute & the plough গ্রন্থে বলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের কাছে সবশ্রেণীর মানুষের স্রোত দেশী-বিদেশী সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে’’। তাই তার বিরুদ্ধে গণবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ তাঁর প্রতি অবিচারই বটে’’।
অমৃতের সন্তান ‘মানুষ’ ছিল তাঁর নিকট অখন্ড জীবনসত্তা। সংগ্রামী, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখদৈন্য, সারল্য, সত্যনিষ্ঠা, মহানুভবতা, শ্রদ্ধাশীলতা, তাঁকেও গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। জমিদার হিসেবে দরিদ্র প্রজাদের যে পরিমাণ খাজনা তিনি মওকুফ করেন তৎকালে তা দিয়ে আরেকটি জমিদারী ক্রয় করা যেত। পল্লী পুনর্গঠন, কৃষিঋণ দান, রাস্তা-ঘাট, জলাধার নির্মাণ, রবীন্দ্র ভারতীসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, ভূমিহীন প্রজাদের (যাদের অধিকাংশই মুসলিম) বিপুল খাসজমি বরাদ্দ দান, দুস্থ-অসহায়দের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। এই সমস্ত জনহিতকর কার্যক্রম মানুষ রবীন্দ্রনাথকে এ্রক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অথচ আত্মতুষ্টির পরিবর্তে তাঁর আত্মোপলদ্ধি…“উপকার করিবার অধিকার থাকা চাই। ‘হিত’ করিবার একটিমাত্র ঈশ্বরদত্ত অধিকার আছে-সেটি ‘প্রীতি’। প্রীতির দানে কোন অপমান নাই কিন্ত হিতৈষিতার দানে মানুষ অপমানিত হয়”। । আমরা ঐ সমাজ বাস্তবতা থেকে রবীন্দ্রনাথকে দেখছি যেখানে দরিদ্র মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে জাকাত-ফেতরা,দান-খয়রাতের মত ধর্মীয় রাজনৈতিক উদ্ধার তৎপরতা সম্পন্ন করা হয়। তিনি যুগোপযোগী, সৃজনশীল,প্রকৃতিসংলগ্ন শিক্ষার মাধ্যমে আত্মউন্নয়ন ঘটিয়ে পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। জমিদার-মহাজনদের খপ্পর থেকে কৃষক ও প্রান্তিক চাষীদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের রক্ষা করতে হবে’। জমিদারী তাঁর জন্মগত হলেও এটাকে তিনি পৌরুষ বা গৌরবের মনে করতেন না বরং নিজেকে ‘পরাশ্রিত জীব’ বলেই ভাবতেন (কালান্ত্র}॥
খ্রীষ্টপূর্ব চারহাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় মুনি-ঋষিদের ধ্যানলদ্ধ জ্ঞানের ফসল-উপনিষদ। উপনিষদের প্রজ্ঞার আলো, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের দর্শন, বৌদ্ধ-বাউল ভাবনা, সুফীবাদী চেতনা রবীন্দ্র মানসে লাভ করেছে এক নতুন মাত্রা। যা তাঁকে দিয়েছে ‘সীমার মাঝে অসীম’কে খুঁজে পাবার অলৌকিকবোধ। মহামতি সক্রেটিসের অভিজ্ঞানে-‘নিজকে জানো’। আর হাদীসে কুদ্সী’র ভাষ্য, ‘‘যে নিজকে জেনেছে, সে স্রষ্টাকে জেনেছে।’’ মহামিলনের-ঐক্যের এই ঐকতানে রবীন্দ্রনাথও একাকার। যিনি মধুময় এই পৃথিবীর ধুলির সন্তান হয়েও অনন্তের দিকে তাঁর দৃষ্টি মেলে আছেন অপলক।
রাষ্ট্রনীতি (কণিকা), কালান্তর, গোরা, রক্তকবরী, কালের যাত্রা, প্রতিটি লেখাই রবীন্দ্রনাথের নিজেকে আবিষ্কার ও অতিক্রম করার অদম্য প্রয়াস। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু জাত্যাভিমান, জাতীয়তাবাদের সংকীর্নতা, সামাজিক বৈষম্য, শাসন-শোষনের বিপক্ষেই আজীবন অনড় অবস্থান, তাঁর রাজনৈতিক দায়বোধের পরিচায়ক। সহজাত ও অন্তর্দৃষ্টির চৈতন্যবোধ দিয়ে তিনি অনুভব করেছেন মুসলিম শাসিত ভারতবর্ষে মধ্যযুগে যে সমন্বয়ী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা’ই বহুধাবিভক্ত ভারতের ঐক্যসূত্র-সৌন্দর্য। তিনি স¤্রাট আকবরের উদারনীতির মুগ্ধ সমর্থক (প্রবাসী ১৩২৪)। ‘‘সেই সময়ে কত মুনি-ঋষি, সাধু-সুফীর আগমন ঘটেছিল, যারা হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের অন্তরতম মিলনক্ষেত্রে এক মহেশ্বরের পূজা বহন করছিলেন’’। তাঁর ইতিহাস অনুধ্যান বলে-নতুন যুগ হবে শুদ্র বা মেহনতী জনতার। ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিপথ ধরেই একদিন পৃথিবীতে সার্বজনীন সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। তাঁর শেষের দিকের রচনা ‘কালের যাত্রা’য় এই প্রতীতীই ফুটে আছে।
মূর্খতা পরম পাপ। সকল অন্যায়-পাপের জন্ম মূর্খতার গর্ভেই। স্বার্থান্ধে-উদ্দেশমূলকভাবেও কেউ কেউ মূর্খতা লালন করেন। রবীন্দ্র নিষেধাজ্ঞায় পাকনেতৃবৃন্দের উর্বর মস্তিস্কে যারা পরমযত্মে জলসিঞ্জন করেছেন, তম্মধ্যে মওলানা আকরম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, বেনজির আহমেদ, গোলাম আযম, ফররুখ আহমদ, আবদুস সবুর খান, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ প্রমুখ। আর রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ-প্রত্যাখানে দ্বিধান্বিত হয়ে যারা দু’কুলই রক্ষা করতে চেয়েছেন তাদের মধ্যে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ আলী আহসান, আশরাফ সিদ্দিকী, তালিম হোসেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
গোষ্ঠীগতভাবে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, রেনেসাঁ সোসাইটি, তমদ্দুন মজলিশ রবীন্দ্র বিরোধীতায় ব্রতী ছিল আমৃত্যু। ইতিমধ্যে বাঙালির জীবনে ১৯৫২ সাল তার জাতিসত্তাকে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাঙালির স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করে রক্তস্নাত একুশ। গ্রহণ-বর্জনের সর্বনাশা খেলার মধ্যেই এসে পড়ে ১৯৬১ সাল। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী। শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, কবি-লেখক, প্রগতিশীল ছাত্র-যুবক সংস্কৃতিকর্মীরা যে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে চারদিনব্যাপী রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করেন তা এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। দেশের অন্যান্য শহরেও সাড়ম্বরে এটি উদযাপিত হয়। এই উৎসব কমিটির সভাপতি ছিলেন বিচারপতি এস এম মুর্শেদ। উৎসবের পুরোভাগে ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জি সি দেব, মুনীর চৌধুরী আবদুল হাই, হাসান হাফিজুর রহমান, রনেশ দাশ গুপ্ত, হাসান আজিজুল হক, সানজিদা খাতুন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আনিসুজ্জামান, কামাল লোহানী, শামসুর রাহমান, রফিকুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হায়াৎ মামুদ, রফিক আজাদ, সুফিয়া কামালসহ অনেক নিবেদিত মনীষা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, ক্রান্তি, ঐকতান, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্লমিলন পরিষদ নানা বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার ধারা অব্যাহত রেখেছে। মওলানা ভাসানী ঐ সময় এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘ইসলাম-সত্য ও সুন্দরের জয় ঘোষণা করেছে। এই সত্য ও সুন্দরের পতাকাকে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। যারা ধর্মের নামে তাঁর ওপর আক্রমন চালাচ্ছে তারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সত্য ও সুন্দরের নীতিতে বিশ্বাসী নন’’। প্রকৃতপক্ষে এই উত্তাল সময়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াই একাকার হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে জন্ম নেয়-বাংলাদেশ। রবীন্দ্রনাথ নীরব ও মধুর এক প্রতিশোধ নিলেন। তার রচিত গানই এদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় অভিসিক্ত হলো। ইতোমধ্যে অনেকে ভোল পাল্টে রবীন্দ্র অনুরাগীতে পরিণত হলেন। কিন্তু রবীন্দ্র বিরোধিতা, উপেক্ষা থেমে থাকেনি। ‘৭৫ এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মূলত কট্টর ডানপন্থী, গণবিচ্ছিন্ন সামরিক স্বৈরাচারী শাসকরাই এদেশের ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। শাসকদের বুদ্ধিবৃত্তিক- সাংস্কৃতিক দৈন্যতা, রাজনৈতিক মন্দা, উগ্র ধর্মান্ধতা, সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতি সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসে। পরাজিত এই অপশক্তি একসময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনেরও চক্রান্ত চালায়। রাষ্ট্র ক্রমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণ-প্রজাতন্ত্রের চরিত্র হারিয়ে মৌলবাদী স্বৈরতন্ত্রের রূপধারণ করে। কিন্তু আজন্ম সংগ্রামী বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম তখনও তুষের আগুন হয়ে জ্বলছিল স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে। ইতোমধ্যে বিশিষ্ট মার্কসবাদী মনীষা ড. আহমদ শরীফের ‘‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’’ (১৯৮৬) এদেশের বিদগ্ধ মহলে তুমুল হইচই ফেলে। এর প্রতিবাদে-প্রত্যুত্তরেও প্রচুর লেখালেখি হয়। পরবর্তীতে ড. শরীফ অবশ্য স্বীকার করেন যে, ‘‘রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অর্ধশতক পর আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ভক্তের বাষ্পাচ্ছন্ন দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করে তাঁর অতুল্য কবিত্বের ও মনীষার উৎস সন্ধান।’’ ‘‘রবীন্দ্রনাথের অতি মার্কসীয় মূল্যায়ন ক্ষতিকর এতে প্রতিক্রিয়াশীলরাই সুযোগ নেবে।’’ শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর এই মন্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের ধারায় যখন বিষয়, প্রসঙ্গ, বক্তব্য নিয়ে উত্তেজনা-বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তখন রসের ও রূপের সত্যটি চাপা পড়ে যায়। সে আর্তনাদ তর্কবাগিশদের কর্ণে পৌঁছে না।
‘৯০ সালে মৌলবাদী-স্বৈরতন্ত্রকে হটিয়ে ডা. মিলন, নুর হোসেনদের রক্ত স্রোত বেয়ে গণতন্ত্র মুক্তি পায়। এ সময় থেকেও রবীন্দ্রচর্চার দ্বার অবারিত ছিল বলা যায়। কিন্তু দ্বার-রক্ষীরা ছিল স্বাধীনতা বিরোধীচক্র। লাখো শহীদের রক্ত-রঞ্জিত পতাকা-মানচিত্রের লাঞ্চনাও আমরা দেখেছি। ক্ষমতাসীনদের মুখে এমনও শোনা গেছে, ‘‘কোথাকার কোন রবীন্দ্রনাথ’’? এদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গজিয়ে উঠেছে অজস্র ক্যাডেট-কওমী মাদরাসা, ইংরেজী মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। লালিত-পালিত হয়েছে অনেক হরিণরূপী হায়েনা। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, দেশপ্রেম ও জাতীয় সংহতি, মানবিক মূল্যবোধ কিংবা জাতীয় সঙ্গীতের ধারও এরা ধারেনা। এ দেশে ২৩% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না। প্রায় অর্ধেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং, গ্রন্থাগার, খেলাধুলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা নেই [২১ জুলাই, সমকাল]। এটা কি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়? জাতীয় ঐক্য ও সংহতিবিরুদ্ধ এরকম বিকৃত জনগোষ্ঠী নিয়ে, বিজাতীয় মূল্যবোধ ধারণ করে মাধ্যম আয়ের মূলোর পেছনে এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটছে বাংলাদেশ।
বলাবাহুল্য যে, আজকের বাংলাদেশে রবীন্দ্রবিরোধী চিহ্নিত অপশক্তি অদৃশ্য কিন্তু নিশ্চিহ্ন নয়। বৈশ্বিক শোষণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আরো নানা জাতের রকমারি ‘দানব’ তৈরীর প্রক্রিয়াও চলমান। ধর্মীয় মৌলবাদও পুঁজিবাদের আজন্ম ক্রীতদাস। দুনিয়াজুড়ে এই স্মার্ট, শিক্ষিত, প্রাযুক্তিক দানবদের নারকীয় তান্ডব প্রত্যক্ষ করছে শান্তিকামী বিশ্ববাসী। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, মসজিদ-মন্দির-গির্জা, রাজপথ, আইনসভা, সেনানিবাস, ঈদগাহ, জাতিসংঘ, প্রত্নতত্ত্ব, পানশালা, ভার্চুয়াল জগৎ এমনকি মাতৃক্রোড়ও এদের বিষাক্ত থাবা থেকে নিরাপদ নয়। আজ যদিও রবীন্দ্রপ্রভাবিত ধারাটির হাতেই রাজদন্ড। কিন্তু তাদের অম্ল-মধুর পরকীয়া ঐ দানবগোষ্ঠীর সাথেই। যা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। রবীন্দ্র সৃষ্টিকর্মের মূলপ্রবণতা হচ্ছে-আসুরিক অপশক্তির বিরুদ্ধে সত্য ও সুন্দরের লড়াই। সূর্যসদৃশ রবীন্দ্রনাথই এই শক্তির মূল উৎস কেন্দ্র। শত শোকে- আঘাতে, বেদনায়, বিরুদ্ধতায়, বৈরিতায় যার অমোঘ উচ্চারণ, …“ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। মানুষ একদিন নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা তুচ্ছ করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন, প্রতিকারহীন, পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি”। বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ এখানেও মাত্রাহীন, উপমাহীন, শিরোনামহীন।
রবীন্দ্র প্রতিভার ঋদ্ধতা, মৌলিকতার যথাযথ উপলদ্ধি একদিকে আমাদের নিবৃত্ত করবে তাঁকে ‘ভাববাদী’ বানিয়ে পূজা করা থেকে। অন্যদিকে তিনি ‘বস্তবাদী’ নন বলে তাকে খারিজ করে দেয়ার মূর্খতা ও অতিবিপ্লবী সাজার হাত থেকে। বাঙালির সংস্কৃতি চেতনার বাতিঘর রবীন্দ্রনাথ আক্রান্ত হলে কিংবা তাঁর প্রতি ঔদাসীন্য দেখালে শঙ্কিত হবার কারণ শুধু একটিই আমরা কি কল্যাণবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? ফিরে যাচ্ছি কি আলো থেকে অন্ধকারে? এই তামসিক সময়ে- সংকটে, শ্রেয়োবোধে, উত্থানে-পতনে, বিহারে-বিরহে, বন্ধনে-মুক্তিতে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের নির্ভরতা কে?
লেখক : রবীন্দ্র গবেষক, সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ