অতীতে, বর্তমানেও যারা নজরুল-রবীন্দ্রনাথকে সমান্তরালে দাঁড় করানোর স্থূল-সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় আক্রান্ত, তারা মূলত কবিযুগলের সৃষ্টিশীলতা, প্রতিভা-প্রবণতা সর্বোপরি তাদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে অবহিত নন। একজন ‘দুখু মিয়া’ কী করে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠেন? আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে পাড়াগাঁয়ের একজন দরিদ্র মুসলিম পরিবারের সন্তান, একদা মুয়াজ্জিন-খাদেম নজরুল ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একজন প্রমীলাকে সহধর্মিণী হিসেবে গ্রহণ করার মনের জোর কোথা থেকে পেয়েছেন? নজরুলের মতো একজন মহান শিল্পীর অন্তর্জগত ও জীবনদীক্ষা বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা ও সামর্থ্য এদের নেই। এরা আজন্ম জেনে এসেছে ‘নজরুল’ নামটি মুসলমানিত্ব বহন করে। মাইকেল নিশ্চয়ই খ্রিস্টান। রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাম যখন- অবশ্যই ‘হিন্দু’। স্থূল ধর্মবোধ তাকে জানায়Ñ নজরুলই তার ‘আত্মীয়’, অন্যরা ‘পর’। এই মানসপ্রক্রিয়া এতোই জান্তব, কা-জ্ঞানহীন, অর্থহীন ও আত্মঘাতী যে বাঙালি মুসলমানদের বিরাট অংশ এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বেরোতে পারেনি আজও।
নজরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে বড় কবি। মাইকেল, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বিশ্ব সাহিত্যেরও অন্যতম কাণ্ডারি। নানাসময়ে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল তৎকালীন পূর্ববাংলায় অবস্থান করেন। শ্যামল বাংলার সবুজ প্রকৃতি, নিসর্গ শোভা, পদ্মাতীরের অপার সৌন্দর্য, নক্ষত্রখচিত অসীম নীলিমা তাকে আলোড়িত-প্লাবিত করেছে। তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে জ¦লজ¦ল করছে বাংলার চিরন্তন রূপ। এই নিরিখে কবি রবীন্দ্রনাথ ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। এখানেই তাঁর কালজয়ী প্রতিভার অভিষেক-উন্মেষ ঘটে।
নজরুল সাহিত্যে পূর্ববাংলার ওইরূপ প্রভাব-বিস্তার নেই। নজরুল নিরবচ্ছিন্নভাবে এখানে অবস্থানও করেননি। এজন্য অনেকে মনে করেন, নজরুলকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্যে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বিবেচনা ক্রিয়াশীল ছিল। তবুও উদার সমন্বয়বাদী চিন্তা-সংস্কৃতির লীলাভূমি বাংলাদেশ বিদ্রোহী কবিকে বুক পেতেই গ্রহণ করেছে স্বাধীন বাংলার স্বর্ণভূমিতে।
নজরুল শৈশবে ঘর ছেড়েছেন। তারপর জীবনভর ‘মন যখন যা চায়’ এই ভাবদর্শনের অশ্বারোহী নজরুলের গতি ছিল দুর্দান্ত ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’। তার ভাবনা ছিলÑ মানবপ্রেম, ঔপনিবেশিক দাসত্ব, সাম্য, সঙ্গীত তথা বিমূর্ত সৃজনশীলতার বিশুদ্ধ আনন্দ। সংকীর্ণতা, হীনতা, নীচতা, গণ্ডিবদ্ধতা তাকে রুখতে পারে নি। দূর থেকেই কবিগুরুর প্রাপ্য প্রণাম সেরেছেন। ‘চির উন্নত মম শির’ যার, ‘সাগরেদী’ তাঁর ধাতে নেই। নজরুলের ভাষায়- “বিশ^কবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি। সকল হৃদয়-মন দিয়ে। যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করি। এ নিয়ে লোকে কত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছেন!” [বড়র পীরিত বালির বাঁধ, ১৯২৭]
অনেকেই জানেন, নজরুলের ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের ‘আশীর্বাদ পত্র’ পাঠানোর ঘটনা। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখে জেলে গিয়েও প্রতিবাদী নজরুল ব্রিটিশ সরকারের নির্যাতন-জুলুমের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন। উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ তখন নজরুলকে টেলিগ্রাম পাঠান যে, অনশন ভঙ্গ করতে হবে। কারণ বাংলা সাহিত্যের জন্য তার প্রয়োজন রয়েছে। ১৩২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করে লেখেন, “… জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল, তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করছি।” এ প্রসঙ্গে নজরুলের হৃদয়মথিত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে- “… তার এই আশীর্বাদ মালা পেয়ে আমি জেলখানার সব জ্বালা-যন্ত্রণা, অনশন-ক্লেশ ভুলে যাই। আমার মতো নগণ্য তরুণ কবিকে তিনি কেন এত অনুগ্রহ, আনন্দ দিয়েছিলেন তা তিনিই জানেন। আমি কোনদিন তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, তিনিও বলেননি। আজ এই প্রথম মনে হল- তার দক্ষিণহস্ত দিয়ে আমার ‘সুন্দর’ এর আশীর্বাদ এসেছিল জেলখানার যন্ত্রণা-ক্লেশ দূর করতে।” [আমার সুন্দর, দৈনিক নবযুগ, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৯]।
১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় নজরুল প্রশ্ন তোলেন- “হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?” অন্যদিকে একইসময়ে রবীন্দ্রনাথ অহিংসার জাগরণ-আকাক্সক্ষা নিয়ে লেখেন- “হিংসায় উন্মত্ত পৃত্থী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব।” বোঝাই যাচ্ছে, চিন্তার দিক থেকে মানসিকভাবে তারা ছিলেন পরস্পরের সান্নিধ্যে। নজরুলের ‘লাঙল’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ধর হাল বলরাম-আন তব মরু-ভাঙ্গা হাল/বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।” নজরুল সশ্রদ্ধচিত্তে তাঁর পত্রিকার প্রচ্ছদপটে দু’লাইনের ওই কবিতাটি মুদ্রিত করেন। ধূমকেতু, লাঙলে দেশ ও জনগণের জন্য নজরুল যে দরদ ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তার সমান্তরালে রবীন্দ্রনাথের জালিয়ানওয়ালবাগ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি বর্জনেও তাদের চিন্তার ঐক্যের পরিচয় বহন করে।
একবার নজরুলের কোনো এক চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। গানটির রেকর্ড অনুমোদনের জন্য শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতাচার্য শৈলজারঞ্জনের অনুমতি প্রার্থনা করা হলে তিনি গুরুতর বিচ্যুতি থাকায় তা অনুমোদন করেননি। কিছুদিন পর নজরুল সদলবলে রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে গানটি অনুমোদনের অনুরোধ করেন। রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় তখন অনুমোদনপত্রে সই করে দেন। যদিও পরে ওই রেকর্ড শুনে রবীন্দ্রনাথ সন্তুষ্ট হতে পারেননি, কিন্তু সে সময় নজরুলকে ফিরিয়ে দেয়া তার পক্ষে সহজ ছিল না। এতোটা প্রীতি, স্নেহ-মমতা, প্রশ্রয়-বাৎসল্য তিনি একমাত্র নজরুলের জন্যই লালন করতেন।
১৯৩৫ সালের ৮ আগস্ট ‘নাগরিক’ নামে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় লেখা পাঠাবার জন্য নজরুল রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ জানিয়ে একটা চিঠি লেখেন। রবীন্দ্রনাথও প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন। নজরুলের পাঠানো চিঠিটা আজও শান্তিনিকেতনে রক্ষিত আছে।
“শ্রীচরণারবিন্দেষু,
গুরুদেব! বহুদিন শ্রীচরণ দর্শন করিনি। আমার ওপর হয়ত প্রসন্ন কাব্যলক্ষ্মী হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরের ভয়ে আমায় ত্যাগ করেছেন বহুদিন। কাজেই সাহিত্যের আসর থেকে আমি প্রায় স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়েছি। আপনার তপস্যায় আমি কখনো উৎপাত করেছি বলে মনে পড়ে না। তাই অবকাশ সত্ত্বেও আমি আপনার দূরে দূরে থেকেছি। তবু জানি আমার শ্রদ্ধার শতদল আপনার চরণস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়নি।
আমার কয়েকজন অন্তরঙ্গ সাহিত্যিক ও কবিবন্ধু ‘নাগরিক’ পরিচালনা করছেন। গতবার পূজায় আপনার কিরণস্পর্শে ‘নাগরিক’ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। এবারও আমরা সেই সাহসে আপনার দ্বারস্থ হচ্ছি। আপনার যে কোন লেখা পেলেই ধন্য হব। ভাদ্রের শেষে পূজা সংখ্যা ‘নাগরিক’ প্রকাশিত হবে। তার আগেই আপনার লেখনী-প্রসাদ আমরা পাব, আশা করি।
আপনার স্বাস্থ্যের কথা আর জিজ্ঞাসা করলাম না।
ইতি
প্রণত
নজরুল ইসলাম।”
রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের অঘটনঘটনপটিয়সী কুশীলবরা উপরোক্ত চিঠি থেকে অনেক তথ্য-উপাত্ত পেতে পারেন। রবীন্দ্রপ্রয়াণের কিছু আগে নজরুল রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে লেখেন-
“যারা জড়, যারা নুড়ির মত নিত্য রস প্রবাহে
ডুবিয়া থেকেও পাইল না রস, তারা তব কৃপা চাহে।
এই ক্ষুধাতুর চির উপবাসী-চির নিপীড়িত। জনগণে
ক্লৈব্য ভীতির গুহা হতে আন আনন্দ-নন্দনে।
উর্ধের যারা তাহারা পাইল তোমার পরম দান
নিম্নের যারা তাদের এবার করগো পরিত্রাণ।”
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মৃত্তিকা-সংলগ্ন বাঙালি কবিদের চিত্তের ভাবউচ্ছ্বাস যেমন করে সঙ্গীতকুসুম হয়ে বিকশিত হয়েছে- পৃথিবীতে তা অনন্য নজিরবিহীন। কবিতা এবং সুর একই স্রষ্টার নিদর্শন হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হয়ে ওঠা বাঙালি কবিদের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। বাঙালি জাতির এই কাব্যসঙ্গীত ধারার শ্রেষ্ঠতম ও সর্বশেষ কবি ও যুগস্রষ্টা গীতিকার হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
স্কুল-কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যথেষ্ট আলো তিনি পাননি। তাকে মসজিদে-মক্তবে, লেটো দলে, হোটেলে, সেনাবাহিনীতে, চলচ্চিত্রে, গ্রামোফোন কোম্পানিতে ইত্যাদি নানা বিচিত্র পেশায় সম্পৃক্ত হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেকে সংযুক্ত রেখেছেন অবারিত প্রকৃতির পাঠশালার সঙ্গে। যে পাঠশালায় সহজ মনের কথাকে গানের সুরে সুরে ছড়িয়ে দেবার সহজাত শিক্ষা কার্যকর ছিল। ঐ প্রাকৃতিক পাঠই তাঁকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করে। পল্লী এবং সাধারণ মানুষ তার গানকে গ্রহণ করেছে নিবিড়ভাবে- নিজের করে। খাঁটি বাংলার ধারার সঙ্গে এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় ঐতিহ্যে পুষ্ট হবার ফলে নজরুল বাংলা কবিতায় নতুন রক্তসঞ্চার করতে সক্ষম হন। নজরুলের গানে প্রাচীন বাংলা গানের ধাঁচটি লক্ষ্যণীয়। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য বা দূরদ্বীপের সুর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও আমাদের ভাসিয়ে নেয়- আনন্দলোকে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন,
“আমার কবিতা, জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।
কৃষাণের জীবনের শরীক যে জন,
কর্মে কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন।
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।”
অবশেষে আমরাও নিশ্চিত হতে পারি না রবীন্দ্রনাথের এই প্রতীক্ষা নজরুলের জন্যই কি?
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ, ঢাকা জেলা



